[হাতের মুঠোয় যখন দুনিয়াবি পড়াশোনার বিশাল চাপ, তখন আল্লাহর কালাম কুরআনুল কারীম বুকে ধারণ করার অদম্য সাহস দেখানো সহজ কথা নয়। আমাদের আজকের অতিথি নজিফা আরিফীন, যিনি স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষে পড়াশোনা করার পাশাপাশি মাত্র আড়াই বছরে কুরআন হিফজ সম্পন্ন করেছেন। জেনারেল লাইনের একজন শিক্ষার্থী হয়েও কীভাবে তিনি এই কঠিন পথ পাড়ি দিয়েছেন, সেই অভিজ্ঞতাই আজ শুনব তাঁর মুখ থেকে। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন— রাহনুমা সিদ্দিকা (শিক্ষার্থী, নুরুল কুরআন একাডেমি)]
প্রশ্ন: আমরা জেনেছি আপনি স্নাতক ২য় বর্ষে পড়েন। জেনারেল লাইনে পড়াশোনা করার পাশাপাশি হিফজ শুরু করার সিদ্ধান্তটা কেন এবং কীভাবে নিয়েছিলেন?
নজিফা: একদম ছোট থেকে আমি খুব determined ছিলাম যে মেডিকেলে পড়ব। ক্লাস টেনের শেষ দিকে আমি বিভিন্ন ইসলামিক বই পড়তে শুরু করি। তখনের প্রায় বই নাস্তিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর নিয়ে লিখা হতো। বইগুলো পড়ে মনে হয়েছিল যে মেডিকেলে না পড়ে ইসলামিক কোনো সাবজেক্টে পড়া যায়। But খুব seriously ভেবেছি এমন না।
ইন্টারে উঠার পরও মেডিকেল টার্গেট ছিল। ঐ সময় ডা. শামসুল আরেফীন শক্তি স্যারের 'ডাবল স্ট্যান্ডার্ড ১, ২' পড়া হয়। এই দুইটা বই আমার ক্যারিয়ার সেন্ট্রিক মনোভাব একদম দূর করে দেয়। তখন ভাবতাম যে, মেডিকেলে পড়লেও চেম্বার করব না। যতই দিন যায় ততই মেডিকেলে পড়া নিয়ে দ্বিধা বাড়তে থাকে।
দ্বিধান্বিত অবস্থাতেই HSC পরীক্ষার ৩ মাস আগেই অনলাইন একটা প্ল্যাটফর্মে (Battles of Biology) মেডিকেল কোচিংয়ের জন্য ভর্তি হই। তখন খুব সিরিয়াসলি প্রিপারেশন নিচ্ছিলাম। HSC পরীক্ষা পরবর্তী ১ মাসও সিরিয়াসলি পড়েছিলাম। এরপর ফাইনালি ডিসাইড করি যে, মেডিকেলে পড়ব না। IIUC-তে কুরআনিক সাইন্স পড়ব। মেডিকেল এডমিশন টেস্টের আগের ১ মাস মা-বাবা ইন্ডিয়া ছিলেন। আমি ইচ্ছামতো ফাঁকিবাজি করার সুযোগ পাই। বই ধরেও দেখি নাই। IIUC-তে এডমিশন টেস্টে আরবি প্রশ্ন থাকে। তাই ঐ সময়টাতে ইউটিউব থেকে 'এসো আরবি শিখি' বইয়ের দারস দেখতাম।
IIUC'র এডমিশন টেস্টের ১ দিন আগে decision change হয়ে যায়। এতদূর রেগুলার যাতায়াত সম্ভব না। তাই বাধ্য হয়ে CU'র প্রিপারেশন নিই। আমার প্ল্যান ছিল একাডেমিকভাবে পড়তে না পারলেও অনলাইনে দ্বীনি পড়াশোনা চালিয়ে যাবো। তাই এমন কোনো সাবজেক্ট choose করা দরকার যেখানে পড়া কম। এই চিন্তা থেকে আমি 'A' unit-এর ফরমও নিই নাই কারণ সাইন্সের সাবজেক্টে ল্যাব ক্লাস থাকে। অনেক সময় দিতে হবে। শেষমেশ CU-তে B&D দুইটা ইউনিটেই চান্স পাই।
অনেক দা'ঈ এবং এক্টিভিস্টের পোস্ট দেখে হিফজের জন্য অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম আগে থেকেই। মারিয়াম মাসুদকে দেখে ঈর্ষা হতো খুব। আমাদের উস্তাদের ভিডিওটা দেখেছিলাম যেখানে তিনি বলেছেন পুরো কুরআন হিফজ করতে না পারলেও যতটুকু সম্ভব করা। আরিফ আজাদ ভাইয়ের একটা পোস্ট থেকে জেনেছিলাম ওনার ওয়াইফ হিফজ করে। এই ব্যাপারটা আমার জন্য তখন অবিশ্বাস্য ছিল। সংসার, বাচ্চা সামলিয়েও যে হিফজ করা যায় এটা উনার পোস্ট পড়েই প্রথম জেনেছিলাম।
যাই হোক, HSC exam-এর পরপরই IOM-এর আলিম কোর্সে ভর্তি হই। কোর্সটির ফার্স্ট সেমিস্টারের এর শেষ দিকে একদিন মুকাররিরাহ আপু বলেছিলেন, আমার পড়া ঠিক আছে। কারো আন্ডারে যেন হিফজ করি। এই কথাটাই মূল catalyst ছিল আসলে! এরপর ফ্রেন্ডের সাথে ডিসকাস করি। ও নুরুল কুরআন একাডেমির কথা বলে (যদিও ও এই একাডেমিতে কখনো কোনো কোর্স করেনি)।
প্রশ্ন: আপনার এই যাত্রায় সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা কে দিয়েছিল?
নজিফা: ওভাবে স্পেসিফিক্লি বলতে পারছি না। এডমিশনের পর অনেক টাইম ওয়েস্ট হচ্ছিলো। তাই ভেবেছিলাম ক্লাস শুরুর আগে যদি ১ পারাও করতে পারি খারাপ কি! এই চিন্তা থেকেই শুরু করা। সবসময় টার্গেট ছিল লাইফে ব্যস্ততা বাড়ার আগেই হিফজ শেষ করতে হবে। এই চিন্তাটার কারণে কন্সিস্ট্যান্ট থাকার চেষ্টা করতাম।
ফ্যামিলি মেম্বার আর কয়েকজন ফ্রেন্ড ছাড়া ব্যাপারটা শুরুর দিকে কেউ জানতো না। আসলে দেখা যায় কোনো কিছু ঝোঁকের বশে শুরু করলেও কিছুদিন পর কন্টিনিউ করা যায় না। কতটুকু যেতে পারব তো জানতাম না। তাই কাউকে বলা হয়নি। সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা যদি বলি তাহলে মারিয়াম মাসুদ আর আরিফ আজাদ ভাইয়ের ওয়াইফের কথা বলা যায়।
প্রশ্ন: শুরুতে কি মনে হয়েছিল যে পড়াশোনা এবং হিফজ দুটো একসাথে সামলানো সম্ভব হবে?
নজিফা: হিফজ শুরুর পর প্রথম ৩ মাস একদম ফ্রি ছিলাম। একাডেমিক পড়াশোনা ছিল না। যখন ক্লাস শুরু হয় তখন ভয় পেয়েছিলাম, সারাদিন তো বাইরেই চলে যাবে কিভাবে হিফজে সময় দিব! এরপর উস্তাযা রুটিন করে দিয়েছিলেন আসা-যাওয়ার সময়টাতে তিলাওয়াত, সবকের নাজেরা পড়ার। আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন।
ফার্স্ট ইয়ার এর শুরুর দিকে একাডেমিক পড়াশোনা নিয়ে মোটামুটি সিরিয়াস ছিলাম। কিন্তু ৬/৭ মাস পর সহশিক্ষা থেকেই মন উঠে যায়। এরপর থেকে জাস্ট পরীক্ষায় পাশ করার জন্য পড়ি। তাই হিফজে ভালোই সময় দিতে পারতাম আলহামদুলিল্লাহ। আমার মনে হয় দুইদিকেই ভালো করার মেন্টালিটি থাকলে হিফজ আরো ধীরে আগাতো। ঐ যে বললাম, আমার শুরু থেকেই ইচ্ছা ছিল যত দ্রুত সম্ভব হিফজ শেষ করা, তাই একাডেমিকের চেয়ে হিফজকেই সবসময় priority দিয়েছি। আলহামদুলিল্লাহ, কুরআনের বরকতে আল্লাহ আমার একাডেমিক জার্নিটাও ইজি করে দিয়েছিলেন। পরীক্ষার আগের ২/১ দিন অল্প পড়েই আল্লাহর রহমতে পার হয়ে যাই। আমি আসলে এটা কখনোই মাথায় আনিনি যে, একাডেমিকের জন্য হিফজ ছাড়ব। হিফজের জন্য আমি একাডেমিকে গ্যাপ দিয়েছি। আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ সহজ করেছেন।
প্রশ্ন: আপনার প্রতিদিনের রুটিন কেমন ছিল?
নজিফা: প্রথম দেড়বছর আমি ফজরের পর পড়া শুনাতাম। ২০২৩ সালের শীতের সময়টাতে ক্লাস শেষে বাসায় আসলাম বিকালে। এসেই খাওয়া-দাওয়া করে পড়তে বসতাম। এতটাই ঘুম আসতো যে, মুখ দিয়ে ভালো করে আওয়াজ বের হতো না তাও কোনোভাবে সবক পড়তাম। এশার ওয়াক্ত অনেক দ্রুত হয়ে যাওয়ায় নামাজটা পড়েই ঘুমিয়ে যেতাম। মাঝরাতে ২টা বা আড়াইটার দিকে উঠতাম। ফজরের পর পড়া দিয়ে ইউনিভার্সিটি যাওয়া লাগতো। যাওয়া আসায় ৩ ঘণ্টার বেশি সময় লাগে। ঐ সময়টাতে তিলাওয়াত করতাম, পাশাপাশি সবকের নাজেরা ঠিক করে রাখতাম, ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে আমুখতা পড়তাম, নামাজে সাতসবক পড়তাম। ইউনিভার্সিটিতে যাতায়াতের সময় পড়ার রুটিনটা আমাকে উস্তাযাই করে দিয়েছিলেন। এমন না যে সবসময় এতটা ডিসিপ্লিনড থাকতে পারতাম। মাঝেমাঝে তো এলেমেলো হতোই।
যখন ধীরে ধীরে দিন বড় হয়ে গেল তখন বাসায় এসে ঘুমিয়ে সন্ধ্যায় পড়তে বসতাম। বিকালে ঘুমানোর কারণে রাতে ঘুম আসতে দেরি হতো। আবার ওদিকে ঠিকই ৩টায় উঠে যেতাম। সবমিলিয়ে ঘুমাতে পারতাম খুব কম। আর ফার্স্ট ইয়ারে খুব বেশি তো পড়তে হয় না। পড়া অফ থাকলে তখন একাডেমিক পড়াটা এগিয়ে রাখতাম।
সেকেন্ড ইয়ার থেকে একাডেমিক পড়াশোনার ব্যাপারে সিরিয়াসনেস একদম জিরো হয়ে যায়। তখন ক্লাসে যেতাম খুব কম। সেক্ষেত্রে, দুপুরে সাতসবক, আমুখতা এবং সন্ধ্যায় সবক ইয়াদ করে রাত ১০টায় উস্তাযাকে পড়া শুনাতাম আলহামদুলিল্লাহ। প্রতি ওয়াক্ত নামাজের পর তিলাওয়াত করতাম।
প্রশ্ন: দিনের কোন সময় হিফজ করতে আপনি বেশি আগ্রহ ফীল করতেন?
নজিফা: পড়া ভালো মুখস্থ হয় সন্ধ্যায় এবং মাঝরাতে। কিন্তু লাস্ট দেড় বছর ধরে আমার রাতে ঘুম আসে অনেক দেরিতে। অনেক সময় ঘুম হয়ই না। তাই মাঝরাতে পড়া সম্ভব হতো না। সবক সন্ধ্যায়ই পড়তাম। এই সময়ে সহজেই মুখস্থ হয়ে যায় আলহামদুলিল্লাহ।
প্রশ্ন: আমরা জেনেছি আপনি মাত্র আড়াই বছরে হিফজ সম্পন্ন করেছেন। মা শা আল্লাহ। বারাকাল্লাহ। এই আড়াই বছর ধারাবাহিকতা বজায় রাখার রহস্য কি?
নজিফা: প্রথমত দ্রুত শেষ করতে চাইতাম দেখে শুরু থেকেই সবক বাড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতাম। তবে স্বাভাবিকভাবেই অলসতা আসে। সবসময়ই যে পড়তে ইচ্ছে করে এমন তো না। অনিয়ম করলে উস্তাযা বকা দিতেন, উনি আমাদের ব্যাপারে খুবই সিন্সিয়ার এবং ডেডিকেটেড। তাই ফাঁকিবাজি করার সুযোগ পেতাম কম। এত দ্রুত শেষ করার পিছনের কারণ - আল্লাহর রহমত, আম্মুর দু'আ এবং উস্তাযার মেহনত।
প্রশ্ন: পরীক্ষা বা ব্যস্ত দিনগুলোতে হিফজ এর পড়া কিভাবে ঠিক রাখতেন?
নজিফা: পরীক্ষার সময়ে উস্তাযা ১ দিন পরপর সবক দিতে বলেছিলেন। আজকে সবক দিলে আগামীকাল সাতসবক, আমুখতা এভাবে।
প্রশ্ন: এমন কোন সময় কি এসেছিল যখন মনে হয়েছিল যে খুব কঠিন হয়ে যাচ্ছে? সেই পরিস্থিতি কীভাবে কাটিয়ে উঠেছেন?
নজিফা: জ্বি, ১০ পারা হওয়ার পর হঠাৎ করেই পড়া কাচা হয়ে যায়। অনেক ভালো করে ইয়াদ করেও পড়া দিতে গেলে ভুলে যেতাম। ১ সপ্তাহ মতো এমনটা ছিল। তখন মনে হয়েছিল, ১০ পারাতেই এই অবস্থা! আমি কি পুরো কুরআন হিফজ করতে পারব! এই সময় অনেক দু'আ করেছি, তাওবার সলাত পড়েছি। এরপর আলহামদুলিল্লাহ ঠিক হয়ে যায়।
প্রশ্ন: আপনার এই জার্নিতে বন্ধু-বান্ধব বা শিক্ষকদের কোন নেতিবাচক বা ইতিবাচক মন্তব্য কি আপনাকে প্রভাবিত করেছিল?
নজিফা: কয়েকজন ফ্রেন্ড জানতো। এরমধ্যে একজন ফ্রেন্ড প্রতি ৫ পারা পরপর আমাকে হাদিয়া দিতো মোটিভেটকরার জন্য। খুব বেশি মানুষ জানতো না। তাই আলহামদুলিল্লাহ, negative কিছু কখনো শুনিনি।
প্রশ্ন: পড়া মুখস্থ করার জন্য আপনি বিশেষ কোন টেকনিক বা পদ্ধতি অনুসরণ করতেন কি?
নজিফা: আমি সবক পড়ার আগে অনুবাদ পড়ে নিতাম। Green Tech-এর Al Quran app টাতে প্রতিটা word এর মিনিং থাকে। প্রতিটা ওয়ার্ডের মিনিংসহ পড়তাম। অনুবাদ পড়ে নিলে আমার জন্য মুখস্থ করা সহজ হতো। বাকিটা সবাই যেভাবে পড়ে ওভাবেই পড়তাম।
প্রশ্ন: পিছনের সবক বা রিভিশনে আপনার কৌশল কী ছিল?
নজিফা: সাতসবক, আমুখতা কত পৃষ্ঠা শুনাতে হবে এটা ফিক্সড। তো, প্রতিটা পৃষ্ঠা ভালো করে ইয়াদ করতাম। এরপর ফোনে রেকর্ড করতাম। তখন যে ভুলগুলো হতো ওগুলো শুধরে নিতাম। এরপর উস্তাযাকে পড়া দেওয়ার আগে প্রতিটা পৃষ্ঠা আবার একবার দেখে+না দেখে পড়তাম।
প্রশ্ন: আপনার পরিবার আপনাকে মানসিক ভাবে কীভাবে সাপোর্ট দিয়েছে?
নজিফা: আসলে আমার মিনিমাম ৭/৮ ঘণ্টা হিফজের পেছনে যেত। কখনো কখনো এরচেয়ে বেশি। আর ১০/১১ ঘণ্টা ঘুমানো লাগে। কখনো বেশি টায়ার্ড থাকলে এরথেকে বেশি ঘুমাই! ঘুম+পড়ার ফাঁকে সময় খুব কম। ঘর গুছানো ছাড়া অন্য কোনো কাজ করতে হতো না। অনেকসময় বেশি ঘুমালে ওটাও করতাম না। আমার পড়া বেশি কিন্তু বাসায় মেহমান আসবে এরকম হলে আমার কোনো কাজ করা লাগতো না। আম্মু আর ছোট বোন সবকিছু করতো, আমাকে পড়ার সুযোগ করে দিতো। পরীক্ষার টাইমে বাবা হিফজ বন্ধ রাখতে বলেন। তাই ঐ টাইমে আমি লুকিয়ে পড়া দিতাম। আর আমাকে গার্ড দিতো আম্মু বা ছোট বোন।
প্রশ্ন: একজন ছাত্রীর জন্য বাসার কাজের পাশাপাশি এই লক্ষ্য পূরণ করা কতটা চ্যালেঞ্জিং ছিল?
নজিফা: অনেক চ্যালেঞ্জিং! বাসার কাজ সামলিয়ে পড়তে গেলে টায়ার্ডনেস কাজ করবে। ফলে পড়া মুখস্থ হতে সময় লাগবে বেশি। আর পড়ার পেছনে সময় দিতে পারবে কম। আমার এই প্রবলেমটা ছিল না আলহামদুলিল্লাহ, তাই এ ব্যাপারে বেশি কিছু বলতে পারছি না।
প্রশ্ন: আমরা জেনেছি আপনি শেষ সবক শুনিয়েছেন বাইতুল্লাহর পবিত্র অংগনে। যেই দিন আখেরি সবক দিলেন সেই মুহূর্তের অনুভূতি কেমন ছিল?
নজিফা: আসলে গত বছর মানে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে আমার সাড়ে ২৯ পারা হয়ে যায়। তখন খুবই এক্সাইটেড ছিলাম। শেষ করা পর্যন্ত ওয়েট করাটাই কষ্টকর হয়ে যাচ্ছিলো!! উস্তাযা বাকি আধাপারা সবক শুনানোর আগে ১ খতম শুনানি দিতে বলেন। সেই সুবাধে আমি কা'বার সামনে শেষ সবক শুনানোর সৌভাগ্যটা পাই আলহামদুলিল্লাহ। খুব তাড়াহুড়োর মধ্যে শুনাতে হয়েছিল। কারণ ওখানে অনেক ভীড়। আমার জন্য উস্তাযারও অনেক কষ্ট হয়ে গিয়েছিল। তাড়াহুড়োই ওভাবে কিছু ফীল করতে পারিনি। শেষ করার অনুভূতিটা আসলে ডিসেম্বরেই ছিল!
উস্তাযা যখন বলেছিলেন বাকি আধাপারা সবক পড়ে দিতে তখন আমার সব ফ্রেন্ডকে জানাই হিফজের ব্যাপারটা। ওরা অনেক খুশি হয়েছিল। Even, আমার সারপ্রাইজও দিয়েছে। ওরা যখন ক্রাউন পরিয়ে দিচ্ছিলো, I felt like আমি এসব কিছুর যোগ্যই না।
প্রশ্ন: কুরআন হিফজ করার পর আপনার ব্যক্তিজীবনে বা পড়াশোনায় কোন পরিবর্তন লক্ষ্য করেছেন কি?
নজিফা: আমি খুবই গুনাহগার বান্দা। ব্যক্তিজীবনে কতটুকু পরিবর্তন হয়েছে জানি না। তবে পড়াশোনার ক্ষেত্রে যেকোনো কিছু মুখস্থ করা অনেক সহজ হয়ে গিয়েছিল। কারণ ব্রেইন প্রতিদিন নতুন পড়া মুখস্থ করতে অভ্যস্ত।
প্রশ্ন: এই কুরআনের জার্নিতে স্মরণীয় একটা ঘটনা বলবেন যা আপনার মনে হয়েছিল যে কুরআনের বরকতে আপনি পেয়েছেন?
নজিফা: ২০২৪ সালের ৮ই জুলাই আমি সূরা বাক্বারাহ শেষ করেছিলাম। এটা একটা স্বপ্নের মতো ছিল, জানেন! কিন্তু কোনো একটা কারণে আমার মন খারাপ ছিল।
তাই ইশরাকের নামাজ পড়ার পর আমি আল্লাহর সাথে কথা বলছিলাম— 'হে আল্লাহ, আমি জানি এটা আমারই ভুল। কিন্তু আমার মনটা বড্ড ভেঙে গেছে। আমি সূরা বাক্বারাহ মুখস্থ করলাম আর আমাকে বকা শুনতে হলো।'
আপনি কি জানেন এই কথোপকথনের ঠিক পরেই কী ঘটেছিল?
আমি আমার বন্ধুর কাছ থেকে একটা উপহার (বুকমার্ক) পেলাম, যেটা সে আমাকে প্রায় এক মাস আগে দিতে চেয়েছিল।
তাছাড়া, বেশ কিছুদিন ধরে আমার মোরগ পোলাও খাওয়ার খুব ইচ্ছা হচ্ছিল। কিন্তু মা কখনো রান্না করার সময় পাচ্ছিলেন না, আবার কখনো সময় থাকলেও ঘরে পর্যাপ্ত উপকরণ ছিল না।
অথচ, ঠিক সোমবার দিন—যেদিন আমি সূরা বাক্বারাহ মুখস্থ শেষ করলাম—মা মোরগ পোলাও রান্না করলেন। এটা কোনোভাবেই কাকতালীয় হতে পারে না যে, একই দিনে আমি বুকমার্কটাও পেলাম আর মা-ও মোরগ পোলাও রান্না করলেন! আমার মনে হচ্ছিল আল্লাহ যেন আমাকে বলছেন, ‘মন খারাপ করো না, হে আমার বান্দা!'
প্রশ্ন: আপনি এই জার্নিতে সোশ্যাল মিডিয়া কিভাবে ইউজ করেছেন?
নজিফা: উস্তাযাকে পড়া শুনানোর আগ পর্যন্ত চালাতাম না। সারাদিনই পড়ার মধ্যে থাকা লাগে। রাতে পড়া দেওয়ার পর ফোন চালাতাম। অনেকক্ষণই চালাতাম আসলে। এটার জন্য গিল্টি ফিল হয়। বাট সারাদিনের পরিশ্রমের পর ওটা ট্রিটের মতো ছিল।
প্রশ্ন: যারা বর্তমানে জেনারেল লাইনে পড়ছে কিন্তু হিফজ করতে চায় তাদের উদ্দেশ্য আপনার পরামর্শ কী?
নজিফা: সবার তো আগে তাজউইদ ঠিক করতে হবে। তাজউইদ ঠিক থাকলে আল্লাহর উপর ভরসা করে শুরু করার পর উস্তাযার কথামতো চলবেন। উনি যেভাবে বলেন ওভাবে চললে আপনি ধীরে ধীরে আগালেও ইন শা আল্লাহ সফল হতে পারবেন। হিফজের পাশাপাশি অন্য কোর্স না করা ভালো। একাডেমিক পড়াশোনার পর যা সময় পাবেন পুরোটায় হিফজে দেওয়ার চেষ্টা করবেন। হিফজ এর আগে ব্যাসিক এরাবিক জানা থাকলে জার্নিটা আরেকটু সহজ হবে ইন শা আল্লাহ। এইতো!
এই পর্যন্ত ৫ জন আমাদের একাডেমিতে পূর্ণ কুরআন হিফজ সম্পন্ন করেছে আলহামদুলিল্লাহ। দক্ষ হাফেজ-হাফেজার কাছে পছন্দ মত সময়ে অনলাইনে হিফজ করতে পারেন। যোগাযোগের জন্য ক্লিক করুন এখানে
শিরোনামের উপর ক্লিক করে হিফজ সম্পন্নকারী অন্যদের জার্নিগুলোও পড়তে পারেন-
২. হিফজ জার্নি: কুরআনের সাথে সম্পর্কের এক অনন্য গল্প
৩. একজন হাফেজা ছাত্রীর সাক্ষাৎকার



